মরছে নদী ধুঁকছে দেশ - Chuadanga News | চুয়াডাঙ্গা নিউজ | ২৪ ঘন্টাই সংবাদ

Sidebar Ads

test banner

Breaking

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Saturday, January 27, 2018

মরছে নদী ধুঁকছে দেশ

আমায় ভাসাইলি রে/ আমায় ডুবাইলি রে/ অকূল দরিয়ার বুঝি কূল নাই রে..’। উর্বরা সমতলের বুকে বয়ে চলা মায়াবী নদীর দেশ বাংলাদেশ। স্বচ্ছ জলের নীল ঢেউয়ে নদীবিধৌত পলিমাটির বুননে গড়া বাংলাদেশ। তাই বাংলার বুকে শিরা-উপশিরা হয়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীতেই জীবনের কূল খুঁজে নিতে হয় বাঙালিকে। বাঙালির জীবনধারণ, ইতিহাস-ঐহিত্য, সংস্কৃতি সবই নদী মিশ্রিত, নদী আশ্রিত। নদীর ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়েই প্রবাহিত হয়েছে বাঙালির জীবনধারা, পেয়েছে নিজস্বতা। নদীর জলে অবগাহন-পরিশুদ্ধি, নদীর জলে চাষাবাদ, মিঠা পানির মাছ, নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ যুগে যুগে বাংলাকে করেছে সমৃদ্ধতর। নদী নিজেকে নিঃস্ব করে দিয়েছে, আমরা শুধুই নিয়েছি। নদী বিলীন হয়েছে, আমাদের অভাব পূরণ হয়নি। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্ম নদীর পানিতে বয়ে আনা ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পলিকণা দিয়ে। লাখো বছরের প্রক্রিয়ায় পলি সঞ্চয় করে নদীই গড়ে তুলেছে ‘ব’ আকৃতির পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম ব-দ্বীপ বাংলাদেশ। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের প্রধান নদীগুলো তার যৌবন হারাচ্ছে, শাখা নদী, উপনদীগুলো মরে বিলীন হয়েছে। সরকারি তথ্যেই নদ-নদীর সংখ্যা ৭০০ থেকে ৪০৫-এ নেমেছে। বেসরকারি তথ্যে এ সংখ্যা আরো কম—২৩০। নদীর উজানে অন্য দেশের বাঁধ নির্মাণ, অপরিকল্পিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড আর দখল রাজত্ব নদীকে অঙ্গহানি করে তিলে তিলে মারছে। নদীর সঙ্গে মরছে নদীর ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশও। কৃষিপ্রধান উত্তরাঞ্চলে মরুকরণ দেখা দিয়েছে, সেচ চাহিদা মেটাতে হচ্ছে মাটির নিচের পানি তুলে। তাতে বিপদ আরো বাড়ছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নামছে, মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশগত বিপর্যয় ঘটছে। নদীভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা হারিয়ে যাচ্ছে, সস্তায় পণ্য পরিবহনের পথ রুদ্ধ হচ্ছে। নদীর মাছ হয়ে উঠছে অমূল্য পণ্য। নদীতে মাছ ধরা, নৌকায় নদী পারাপার করা জেলে-মাঝিদের জীবনধারা বাস্তব থেকে চিত্রশিল্প হয়ে দেয়ালে শোভা পাচ্ছে।কেবল ভূখণ্ড সৃষ্টি আর দেশকে সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলাই করেনি নদী; বাংলার শুধু নয়, বিশ্বের প্রায় সব সভ্যতার বিকাশও ঘটিয়েছে নদী। খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ বছরের পুরনো সভ্যতার খোঁজ মিলেছে নরসিংদীর উয়ারী-বটেশ্বরে, পুরনো ব্রহ্মপুত্রের পারে। মহাস্থানগড় থেকে পাহাড়পুর, ময়নামতি, কোটালীপাড়া, সোনারগাঁ, খলিফাতাবাদ, বারোবাজার জনপদ গড়ে উঠতেও ভূমিকা রেখেছে নদী। মুক্তিযুদ্ধেও মায়ের রূপে অবির্ভূত হয়েছে নদী। ‘তোমার আমার ঠিকানা/ পদ্মা মেঘনা যমুনা’ স্লোগান বাংলার দামাল ছেলেদের রক্তে স্বাধীনতার খরস্রোত জাগিয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে উত্তাল শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চও এই স্লোগানে প্রকম্পিত করে তরুণ প্রজন্মকে। মোগলরাও বাংলা সুরক্ষিত রাখতে এ অঞ্চলে শক্তিশালী নৌবহর গড়ে তোলে। আবুল ফজলের বিখ্যাত ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে বলা আছে, ‘তখন ঢাকা ছিল নৌবহরের সদরঘাঁটি।’ এ দেশে আছে খরস্রোতা নদী, আছে শান্ত নদী। বিশাল উত্তাল পদ্মা, মেঘনা, যমুনাও রয়েছে। নদীর ক্ষয়ে ক্ষয়ে যায় মানুষের জীবনও। উনিশ শতকে ভৈরব, কপোতাক্ষ, যমুনা মজে যেতে থাকলে যশোরে লোকসংখ্যা কমতে থাকে। সতীশচন্দ্র মিত্রের মতে, ১৮৮১ থেকে ১৯১১ সাল পর্যন্ত ৩০ বছরে যশোরে লোকসংখ্যা কমে যায় ৫০ হাজার। মরা নদীতে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ বাড়ে। ঔপন্যাসিক সৈয়দ ওয়ালী উল্লাহ ১৯৬৮ সালে মরা নদী ও নদী-তীরবর্তী মানুষকে নিয়ে লেখেন ‘কাঁদো নদী কাঁদো’ উপন্যাস। ওই সময়ই চিত্রা নদী তাজা হয়, জনবসতি বাড়তে থাকে নড়াইল ও মাগুরায়। প্রকৃতির আশীর্বাদ হিসেবে পাওয়া যে নদীর এত দান, সেই নদীর প্রাণ কেড়ে নিতে চলছে যেন প্রতিযোগিতা। স্বাধীনতার আগে বাংলাদেশে নদ-নদীর সংখ্যা ছিল সাত শরও বেশি, এখন তা ৪০৫টিতে নেমেছে। বেসরকারি সংস্থাগুলোর তথ্যে নদীর সংখ্যা আরো কমে ২৩০টিতে নেমেছে। ১৯৯৯ সালে প্রকাশিত ‘মিজানুর রহমানের ত্রৈমাসিক পত্রিকা’র নদীসংখ্যায় বাংলাদেশে নদীর সংখ্যা ২৩০ থেকে ২৭০টি বলে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ সাড়ে চার দশকে প্রায় পাঁচ শ নদী মরে গেছে, নদীপথের দৈর্ঘ্য-প্রস্থ উভয়ই কমেছে। নদীর সঙ্গে কমছে নৌপথও। স্বাধীনতাকালে নৌপথ ছিল ২৪ হাজার কিলোমিটার, এখন নেমেছে ছয় হাজার কিলোমিটারে। শীতকালে নৌপথ আরো কমে নামে তিন হাজার ৮২৪ কিলোমিটার। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রের এক হিসাবে দেখা গেছে, দেশে লঞ্চ, স্টিমার, কার্গো, ট্রলার, ফেরি নৌকা এবং বার্জের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩০ লাখ টন মালামাল পরিবহন হয়। নৌপথে পরিবহন ব্যয় সড়কপথের চেয়ে অন্তত ২০ গুণ কম হয়। নদীর নাব্যতা না থাকায় শীতকালে সড়কপথে পণ্য পরিবহন করতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, যা দেশে পণ্যমূল্য বাড়িয়ে দিচ্ছে, শিল্পের উৎপাদন খরচ বাড়াচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নদী মরলে শুধু অর্থনীতিতেই বিরূপ প্রভাব পড়ে না, একই সঙ্গে জনজীবনে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে অভিঘাত নেমে আসে। নদীহীন জনপদে নদীর জন্য শুধু হাহাকারই নয়, বহুমাত্রিক সংকটও তৈরি হচ্ছে। বিশিষ্ট গবেষক ও পরিবেশ আন্দোলনের নেতা সৈয়দ আবুল মকসুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, নদীগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির সম্পর্ক নিবিড়। বাংলার নদ-নদীগুলোর অপমৃত্যু জীবনের ওপর শুধু ভয়াবহ বিরূপ প্রতিক্রিয়াই সৃষ্টি করবে না, জাতীয় জীবনের সব অগ্রগতিকে স্তব্ধ করে দেবে। দেশের নদ-নদীর এই করুণ অবস্থার জন্য বিশেষজ্ঞরা উজানে একতরফা বাঁধ নির্মাণ, বাংলাদেশের নদ-নদী শাসনব্যবস্থায় ত্রুটি ও নদী দখল-দূষণকে দায়ী করেছেন। বাংলাদেশের প্রধান নদী পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও ব্রহ্মপুত্রের একাধিক স্থানে শুষ্ক মৌসুমে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পর্যাপ্ত নাব্যতা না থাকার কারণে নৌ চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষের দিকে ঢাকার সদরঘাট থেকে একটি লঞ্চে করে পটুয়াখালীর পায়রাতে যাওয়ার সময়ই মেঘনা নদীর একাধিক স্থানে নাব্যতা সংকটের কারণে লঞ্চ আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। খরস্রোতা নদীগুলো পৌষ-মাঘ মাসেই ধু-ধু বালিতে রূপ নেয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সব নদ-নদীতে বছরে প্রায় এক হাজার ৪০০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। এর মধ্যে ভারত থেকে আসা নদীগুলো বয়ে আনে প্রায় এক হাজার ৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার। বাকি ৩৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি দেশের অভ্যন্তরে বৃষ্টিপাত থেকে আসে। বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ এই বিপুল জলরাশির দক্ষ ও উপযুক্ত ব্যবস্থাপনায় কোনো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। ফলে নদীর পানির বড় অংশই ঢালে বয়ে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়ছে, কাজে লাগাতে পারছে না বাংলাদেশ। তবে ২০০৯ সালের পর বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে নদী খননে অনেক প্রকল্প ও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবারও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, উন্নয়ন ও দেশ রক্ষায় নদ-নদী বাঁচাতে হবে। এ লক্ষ্যে তিনি ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ের ওপর জোর দিয়েছেন। নদীবিধৌত বাংলাদেশে বড় বন্যায় নদী ফুলে পানি লোকালয়ে এলেও প্রাণহানির আশঙ্কা থাকত না। বন্যার পানি নেমেও যেত তাড়াতাড়ি। ফলে ক্ষেতের ফসলও খুব বেশি নষ্ট হতো না। বরং পলির আশীর্বাদে শস্য-শ্যামলা হয়ে উঠত দেশ। কিন্তু ভারত পদ্মা নদীর ওপর ফারাক্কা বাঁধ দেওয়ার পর বন্যার চরিত্র পাল্টে যায়। দেশে আগ্রাসী বন্যা হয় ১৯৭৪, ১৯৮৭, ১৯৮৮, ২০০৪ ও ২০১৭ সালে। প্রাণহানি কিংবা আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবে এসব বন্যা পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে দেয়। প্রলয়ংকরী এসব বন্যার মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা মানুষ সৃষ্ট কারণকেই দায় দিচ্ছেন। সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ করে শাখা, উপ-নদী বন্ধ করে দেওয়া, নাব্যতা হ্রাস, উজানে বাঁধ, অনেক নদী মরে যাওয়া, খাল-বিল ভরাটের কারণেই প্রলয়ংকরী বন্যা হচ্ছে বলে জানাচ্ছেন তাঁরা। ফারাক্কা নির্মাণের চার দশকের মধ্যে পদ্মাসহ দেশের বড় বড় নদীগুলোর প্রবাহ মারাত্মকভাবে কমে গেছে। পদ্মা নদীর বড় অংশে চর পড়েছে। কৃষি কাজে সেচেও পড়েছে বিরূপ প্রভাব। আর তিস্তার উজানে ভারতের গজলডোবায় বাঁধ দেওয়ায় তিস্তায়ও মিলছে না পানি। ফলে মিঠা পানির নদীতে ঢুকে পড়ছে সমুদ্রের লোনা পানি। ভারত, নেপাল ও ভুটান ৫৫২টি বাঁধের মাধ্যমে দুই লাখ ১২ হাজার ২৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে হিমালয় থেকে নেমে আসা বিভিন্ন নদীর ওপর ৪২৯টি বাঁধ দিয়ে এক লাখ ২৬ হাজার ৫৮৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে ভারত। এসব প্রকল্পের বেশ কিছুর নির্মাণকাজ চলছে, বাকিগুলো প্রস্তাবিত। চীন ব্রহ্মপুত্র নদের উত্পত্তিস্থলে বাঁধ দিয়ে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে। তিব্বতের অংশে ইয়ারলাং স্যাংপো নামের এই নদীতে বাঁধ দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ছাড়াও মঙ্গোলিয়ার ভেতরের দিকে পানি নিয়ে যাবে চীন। এতে চীন থেকে ভারত অংশে ব্রহ্মপুত্র নদে পানি কমবে, আরো কমে যাবে বাংলাদেশ অংশে। বাঁধ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষণা করা ভারতীয় বিশেষজ্ঞ শ্রীপাদ ধর্মাধীকারী ‘মাউন্টেইন অব কংক্রিট : ড্যাম বিল্ডিং ইন দ্য হিমালয়াস’ শীর্ষক গবেষণায় বলেছেন, ‘এ ধরনের বাঁধ নির্মিত হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশ।’ বিশিষ্ট পরিবেশবিদ ড. আইনুন নিশাত বলেন, ভারত গঙ্গার পানি নিচ্ছে দাক্ষিণাত্যের পশ্চিম পাশে। আর ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে যাবে দাক্ষিণাত্যের পূর্ব পাশে। বাংলাদেশের যে পানির প্রয়োজন আছে, সেটি ভারত ভুলতে বসেছে। ভারতের পানির চাহিদা যতই বাড়ুক, তাদের এমন কিছু করা উচিত হবে না, যাতে ভাটিতে থাকা বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভারতের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই এর সমাধান করতে হবে। বাংলাদেশের নদী মরে যাওয়ার আরেকটি বড় কারণ নদীকেন্দ্রিক অপরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন। পদ্মা ও যমুনার সংযোগকারী বড়াল নদের মুখে ১৯৮৫ সাল থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত স্লুইস গেট, ক্রস ড্যাম, বক্স কালভার্ট নির্মাণ করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল বড়ালের পানি ব্যবহার করে খাদ্য উৎপাদন ও পানিপ্রবাহ বাড়ানো হবে, নৌপথ সম্প্রসারণ হবে। প্রথম তিন বছর প্রকল্পের সুফল মিললেও এরপর থেকেই শুরু হয় বিপর্যয়। পদ্মা নদীর পানিপ্রবাহ কম থাকার সময় বড়ালের মুখে স্লুইস গেট বসানোয় পদ্মা থেকে বড়ালে পানিপ্রবাহ আরো কমে যায়। ফলে বহু স্থানে সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।  অন্যদিকে যমুনার যে অংশে বড়াল নদী মিশেছে সেখানে পানিপ্রবাহ নিম্নস্তরে নেমে যাওয়ায় দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন, ক্ষতিগ্রস্ত হয় যমুনাও। বড়াল শুকিয়ে শুকনা মাঠে পরিণত হয়। সেই মাঠ এখন নদী খেকোদের দখলে। নব্বই দশকের গোড়ার দিকে নড়াইলের লোহাগড়ার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নবগঙ্গা নদীতে বাঁধ দিয়ে এর পূর্ব-উত্তরাংশের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। তখন থেকে ধুঁকতে ধুঁকতে এখন নদীটি মৃতপ্রায়। আর যে অংশে বাঁধ দিয়ে স্লুইস গেট বসানো হয়েছিল, তা এখন শুকনা খাল। সেচকাজে এ নদীর পানি ব্যবহার করা ও বন্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে দেওয়া বাঁধ কেড়ে নিয়েছে নদীটির প্রাণ। অবৈধ দখলদাররাও গ্রাস করে ফেলছে নদীগুলো। ঢাকার তুরাগ নদীর মিরপুর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত ১৮ কিলোমিটার প্রবাহ থাকলেও এটি অতিকায় শীর্ণ। এ অংশে নদীর বড় অংশই দখলবাজদের দখলে। বেড়িবাঁধের চটবাড়ী এলাকায় নেবারল্যান্ড নদীর জায়গা দখল করে গড়ে উঠেছে পার্ক। এই পার্কের ভেতর নদীর পিলারও রয়েছে। নদীর বুকে অনেক স্থাপনা গড়ে উঠলেও নির্বিকার প্রশাসন। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) তথ্যানুযায়ী, তুরাগে ১৫২টি সীমানা পিলারের মধ্যে ৯০টিই অবৈধ দখলের কারণে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে। নদী দখলের এই চিত্র সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের নদীর প্রাণহীন হওয়ার জীবনচিত্রকেই তুলে ধরে। পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কারণেও মরছে নদী। যে উন্মুক্ত জলাশয়গুলো ছিল সেগুলো দখল হয়ে ভরাট হয়েছে। ফলে শুধু মাছই কমছে না, ওই জলাশয়গুলো থেকে নদীতে যে পানি যেত, সেটিও নষ্ট হচ্ছে। জলাশয়গুলো রক্ষা করা গেলে নদীর প্রবাহ ঠিক থাকবে। মুক্ত পানির সঙ্গে সখ্য থাকা মাছও হারিয়ে যাচ্ছে নদীর সঙ্গে। একসময় দেশের মাছের চাহিদার প্রায় পুরোটাই জোগান দিত দেশের নদ-নদী, হাওর, বাঁওড় ও বিলগুলো। প্রতিবছর যেমন নদী কমছে, কমছে মিঠা পানির মাছের পরিমাণও। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের নদীগুলোতে একসময় ২৯০ প্রজাতির মাছ পাওয়া যেত। এখন এ সংখ্যা ১০০-র নিচে। নদ-নদীর মাছ কমে যাওয়া প্রসঙ্গে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ কালের কণ্ঠকে বলেন, জলাশয় সংকুচিত হচ্ছে। নদ-নদীতে মাছের প্রজননক্ষেত্র নষ্ট হচ্ছে, বিচারণক্ষেত্র কমে যাচ্ছে। এ কারণে মাছের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। তবে এ সরকার নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য এরই মধ্যে নদী খননের বহু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এগুলো বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব কারণে নদী মরে যাচ্ছে, দখল হচ্ছে, তা প্রতিরোধ করতে হবে শক্তভাবে। যত্রতত্র উন্নয়ন প্রকল্প হাতে না নিয়ে নদীবান্ধব প্রকল্প নিতে হবে। নদীর দূষণ ঠেকাতে হবে। উজানে যেসব নদীর ওপর ভারতসহ অন্যদেশ বাঁধ দিয়েছে ও দিচ্ছে, আলোচনা করে সেসব নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জোরালো ভূমিকা নিতে হবে। নদী শাসনের বদলে নদীর সঙ্গে সহাবস্থান করার পদক্ষেপ নিতে হবে। যত্রতত্র বাঁধ, পোল্ডার, স্লুইস গেট দিয়ে নদী শাসনের নামে নদী হত্যা বন্ধ করতে হবে। নদীর দখলবাজি শক্ত হাতে বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ড. আব্দুল মতিন কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নদীর পক্ষে থাকতে হবে। সরকারকে ‘নদী নীতি’ করতে হবে। এই দেশে বহু অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে নীতি থাকলেও নদী নিয়ে নীতি নেই। সেই নীতি বাস্তবায়নে সংসদে আইন পাস করতে হবে। সরকার শক্ত হলে নদী রক্ষা পাবে। কারণ দেশের বিভিন্ন স্থানে নদী দখল করে থাকেন সাধারণত সরকারি দলের স্থানীয় নেতারা। তিনি আরো বলেন, ‘ভুল উন্নয়ননীতি আমাদের নদীকে ধংস করেছে। নদী শাসন নয়। নদীকে নষ্ট না করে তার সঙ্গে কিভাবে সহাবস্থান করা যায়, সেটি ভাবতে হবে।’ পানি সম্পদ মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশে একসময় অনেক নদ-নদী ছিল। সেসব নদ-নদীর দখল রোধ ও নাব্যতা রক্ষায় আগের সরকারগুলোর আমল থেকেই সেভাবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যার ফলে নদীগুলো শুকিয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক নদী মরেও গেছে। তবে বর্তমান সরকার নদ-নদী রক্ষায় লক্ষ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিচ্ছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদ-নদীগুলোতে প্রাণ ফিরে আসবে।’

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here