বাবর-পিন্টুর ফাঁসি, তারেকের যাবজ্জীবন - Chuadanga News | চুয়াডাঙ্গা নিউজ | ২৪ ঘন্টাই সংবাদ

Sidebar Ads

test banner

Breaking

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Thursday, October 11, 2018

বাবর-পিন্টুর ফাঁসি, তারেকের যাবজ্জীবন

রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে ১৪ বছর আগে আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, সাবেক শিক্ষা উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা বা এনএসআইয়ের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম এবং হানিফ পরিবহনের মালিক মো. হানিফসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর (খালেদা জিয়া) রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী এবং বিএনপির সাবেক এমপি কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদসহ ১৯ জনকে দেওয়া হয়েছে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। 
এ ছাড়া পলাতক ১৮ আসামির প্রত্যেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল বুধবার ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন এই রায় ঘোষণা করেন। নাজিমুদ্দীন রোডে পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারের পাশে স্থাপিত বিশেষ এজলাসে ঘোষণা করা হয় দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এ রায়।
২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের দুই মামলার রায় ঘোষণা করা হয় একই সঙ্গে। হত্যা মামলায় ১৯ জনকে ফাঁসির দণ্ড, ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ১১ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। আর বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় ১৯ জনকে ফাঁসি এবং ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই ৩৮ জনকে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের অন্য ধারায় ২০ বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। দুই মামলায় আলাদাভাবে সাজা দেওয়া হলেও তা একযোগে কার্যকর হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাবর, পিন্টু, রেজ্জাকুল, রহিম ও হানিফ ছাড়া ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন হুজিবি নেতা মাওলানা তাজউদ্দিন (আবদুস সালাম পিন্টুর ভাই), হুজির প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা শেখ আবদুস সালাম, কাশ্মীরভিত্তিক জঙ্গি নেতা ইউসুফ ভাট ওরফে আবদুল মাজেদ ভাট (পাকিস্তানি), কাশ্মীরভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তৈয়বার নেতা আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোহাম্মদ ওরফে জিএম, হুজি নেতা মাওলানা শওকত ওসমান ওরফে শেখ ফরিদ, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান ওরফে অভি (মুফতি হান্নানের ভাই), মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের (তাজউদ্দিনের ভায়রা), হুসাইন আহম্মেদ তামিম, মইনুদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন ওরফে আবু জান্দাল ওরফে মাসুম বিল্লাহ, রফিকুল ইসলাম ওরফে সবুজ ওরফে খালিদ সাইফুল্লাহ ওরফে শামিম ওরফে রাশেদ ও মো. উজ্জ্বল ওরফে রতন। হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের উভয় মামলায়ই এই ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
হত্যা মামলার রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হত্যার উদ্দেশ্যে একই অভিপ্রায়ে পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হামলা করেছেন বলে রাষ্ট্রপক্ষ সন্দেহাতীতভাবে তাঁদের অপরাধ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ৩ ও ৬ ধারায়ও এঁদের
মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, পরস্পর যোগসাজশে শক্তিশালী আর্জেস গ্রেনেড সরবরাহ ও পরিকল্পনা করে, প্ররোচনা দিয়ে এবং অনেক আসামি সরাসরি অংশ নিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেছেন বলে প্রমাণিত হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেক আসামিকে প্রত্যেক মামলায় এক লাখ টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের প্রত্যেকে গ্রেনেড হামলা করে সমাবেশে উপস্থিত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাসহ অসংখ্য নেতাকর্মীকে মারাত্মকভাবে জখম করার দায়ে দণ্ডবিধির ৩০৭ ধারায় প্রত্যেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছে। তবে ফাঁসি কার্যকর হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড রহিত হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, কায়কোবাদ ছাড়া যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত অন্য আসামিরা হলেন হুজি নেতা শাহাদত্ উল্লাহ জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ ওরফে আবু ওমর হুমায়রা ওরফে পীর সাহেব, মাওলানা সাব্বির আহমেদ ওরফে হান্নান সাব্বির, আরিফ হাসান সুমন ওরফে আবদুর রাজ্জাক, হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, আবু বকর ওরফে হাফেজ ওরফে সেলিম হাওলাদার, মো. আরিফুল ইসলাম ওরফে আরিফ (ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কমিশনার), মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুসালিন ওরফে মুরছালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, মো. লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আবদুল হাই ও বাবু ওরফে রাতুল বাবু ওরফে রাতুল (পিন্টুর ভাই)। দুই মামলায়ই এই ১৯ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই আসামিদের বিরুদ্ধেও দুটি মামলায়ই রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, এঁরাও অপরাধজনক ষড়যন্ত্র ও পরিকল্পনা করে গ্রেনেড হামলায় অংশগ্রহণকারীদের সহায়তা করেছেন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত প্রত্যেককে দুই মামলায় আলাদাভাবে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা অনাদায়ে আরো এক বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মারাত্মক জখম করার অপরাধেও (দণ্ডবিধির ৩০৭ ধারায়) যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে উভয় দণ্ড একসঙ্গে চলবে বলে আদেশ দেওয়ায় প্রত্যেককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে।
হত্যা মামলায় পুলিশের সাবেক দুই আইজি মো. আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হককে দুই বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়ায় দণ্ডবিধির ২১২ ধারায় দুই বছর করে এবং কোনো অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করায় দণ্ডবিধির ২১৭ ধারায় আবার দুই বছর করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তবে উভয় শাস্তি একই সঙ্গে চলবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে রায়ে।
অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে লে. কমান্ডার (অব.) সাইফুল ইসলাম ডিউক (খালেদা জিয়ার ভাগ্নে), লে. কর্নেল (অব.) সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার ও মেজর জেনারেল (অব.) এ টি এম আমিনকে দুই বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মাওলানা তাজউদ্দিনকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সহযোগিতা করায় এঁদের প্রত্যেককে আরো দুই বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। উভয় ধারায় প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানাও করা হয়েছে। জরিমানার টাকা পরিশোধ না করা হলে আরো ছয় মাস করে কারাভোগ করতে হবে প্রত্যেককে।
পুলিশের সাবেক ডিআইজি খান সাঈদ হাসান, তৎকালীন পুলিশ সুপার মো. ওবায়দুর রহমান খানকেও অপরাধীকে আশ্রয় দেওয়ার দায়ে দুই বছর এবং অপরাধীকে রক্ষার ব্যবস্থা করায় দুই বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে। এই দুজনকে আরো দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে মামলার আলামত নষ্ট করার দায়ে।
মামলার তদন্ত তদারকি কর্মকর্তা ও তদন্ত কর্মকর্তা সাবেক আইজিপি খোদাবক্স চৌধুরী, সাবেক এসপি রুহুল আমিন, সাবেক এএসপি আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমানকে দণ্ডবিধির ২১৮ ধারায় (অপরাধীকে শাস্তি থেকে বাঁচানোর অপরাধ) দুই বছরের কারাদণ্ড এবং দণ্ডবিধির ৩৩০ ধারায় (কারো মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করতে বাধ্য করা) তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জরিমানা করা হয়েছে ৫০ হাজার টাকা করে।
আদালত রায়ে বলেছেন, সব আসামির বিরুদ্ধে অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নির্দেশ দেন আদালত। তবে এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৭৪ ধারা মোতাবেক হাইকোর্টের অনুমোদন নিতে হবে। এ জন্য মামলার নথি দ্রুত হাইকোর্টে পাঠানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা ইচ্ছা করলে রায়ের ৩০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিল করতে পারবেন। আদালত রায়ে বলেন, দণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামিরা গ্রেপ্তার হওয়ার পর বা তাঁরা আত্মসমর্পণ করার পর রায় কার্যকর হবে। রায় ঘোষণা শেষে কারাগারে থাকা ৩১ আসামিকে আবার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
এর আগে সকাল ১১টার দিকে কারাগার থেকে আসামিদের হাজির করা হয় ট্রাইব্যুনালে। প্রথমে লুৎফুজ্জামান বাবর, পরে রেজ্জাকুল হায়দার ও আবদুস সালাম পিন্টুকে ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হয়। পর্যায়ক্রমে হাজির করা হয় অন্য আসামিদের। সকাল ১১টা ৩৬ মিনিটে বিচারক রায় ঘোষণা করতে এজলাসে ওঠেন।
পলাতক ১৮ আসামি : মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে মো. হানিফ, মাওলানা তাজউদ্দিন পলাতক রয়েছেন। যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে পলাতক আছেন তারেক রহমান, হারিছ চৌধুরী, শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, রাতুল বাবু, মহিবুল মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন, মো. খলিল, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল, মাওলানা লিটন, মুফতি শফিকুর রহমান ও মুফতি আবদুল হাই। এ ছাড়া সাবেক সেনা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দার, এ টি এম আমিন, সাবেক ডিআইজি খান হাসান সাঈদ, সাবেক এসপি মো. ওবায়দুর রহমান পলাতক রয়েছেন।
বাবর বলেন, ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলাম না : রায় ঘোষণার পর লুত্ফুজ্জামান বাবর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। অন্য কেউ কোনো কথা বলেননি। বাবর বলেন, ‘আমি এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করব। আমি কোনো প্রকার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলাম না। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে আমাকে জড়ানো হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আল্লাহর কসম এই গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে কিছু জানতাম না। আল্লাহ অবশ্যই ভালো জানেন, কে কি করেছে। আমি ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছি।’
আসামি আবদুস সালাম পিন্টু নিশ্চুপ ও খুব বিমর্ষ ছিলেন। তবে জঙ্গি আসামিরা বেশ হৈচৈ করে।
মামলা : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে গ্রেনেড হামলার পরদিন মতিঝিল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন ওই থানার এসআই শহীদ ফারুক আহমেদ। মামলায় হত্যার অভিযোগসহ বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের ধারাও যুক্ত করা হয়েছিল।
প্রথমে তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ওই থানার এসআই আমির হোসেন। পরে মামলাটি ডিবিতে গেলে তদন্তের ভার পড়ে এসআই শামসুল ইসলামের ওপর। এরপর মামলা সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়। সিআইডির তৎকালীন এএসপি আব্দুর রশিদ ও মুন্সী আতিকুর রহমান তদন্ত করেন। তদারকি কর্মকর্তা ছিলেন সিআইডির এস এস রুহুল আমিন। তদন্ত ভিন্ন খাতে নিতে নানা কৌশল নেন তাঁরা।
জজ মিয়া নামের এক নিরীহ যুবককে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায় করেন ওই তিন কর্মকর্তা। ওই স্বীকারোক্তিতে কিছু সন্ত্রাসীকে জড়ানো হয়। চেষ্টা করা হয় আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মীকে জড়ানোর। এরপর ব্যাপক সমালোচনা হলে অন্ধকারে চলে যায় মামলার তদন্তকাজ। ওই সময়ই অভিযোগ উঠেছিল, তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের ইন্ধনে ওই তিন কর্মকর্তা মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করেন। এ ছাড়া হাওয়া ভবনের কর্ণধারদের ইন্ধন ছিল ব্যাপক। একসময় চুপ হয়ে যায় সিআইডি। তদন্ত আর এগোয় না। জোট সরকারের পুরো সময়ই ২১ আগস্টের ঘটনাটি জজ মিয়া নাটকে আটকে থাকে।
তবে এক-এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তদন্ত জোরদার হয়। ২০০৭ সালের ২২ আগস্ট এই মামলার তদন্তভার দেওয়া হয় এএসপি ফজলুল কবীরকে। পাশাপাশি র‌্যাবও ছায়া তদন্ত করে। ৯ আসামিকে গ্রেপ্তার করার পর তদন্ত কর্মকর্তা নিশ্চিত হন, প্রভাবশালী মহলের ইন্ধনে জঙ্গিরা ওই হামলা চালিয়েছিল। পরে বিএনপি নেতা ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টু, জঙ্গি নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করে চার্জশিট দেন তিনি ২০০৮ সালের ৯ জুন।
কিন্তু ওই তদন্তে গ্রেনেডের উৎস এবং গ্রেনেড হামলার পরিকল্পনার পেছনে কারা জড়িত তা উদ্ঘাটন না করেই তড়িঘড়ি করে চার্জশিট দেওয়া হয়। সে কারণে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আবার তদন্ত হয়। ২০০৯ সালে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। দুই বছর তদন্তের পর ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এরপর বিচার শুরু হতে কেটে যায় আরো আট মাস। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের দুটি মামলায় অধিকতর তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করে সিআইডি। উভয় মামলায় তারেক রহমান, লুৎফুজ্জামান বাবর, হারিছ চৌধুরী, কায়কোবাদ, আলী আহসান মোহাম্মাদ মুজাহিদসহ ৩০ জনকে নতুন আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাসহ পুলিশ কর্মকর্তা এবং মুফতি হান্নানসহ তাঁর অনুসারী জঙ্গিরাও আছে। নতুন তদন্তে প্রকাশ পায়, হাওয়া ভবনে বসেই বিএনপির রাজনীতিকরা ওই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন।
এদিকে নতুন করে ৩০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করায় এ মামলার আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে মামলা স্থানান্তর হওয়ার পর ২০১২ সালের ১৯ মার্চ আবার আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। পরে সাক্ষ্য নেওয়া হয় ২২৫ জনের। গত বছরের ১১ অক্টোবর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হয়।
এই মামলার বিচারেও দেখা দেয় নানা জটিলতা। এই মামলায় গ্রেপ্তার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সারা দেশের বিভিন্ন আদালতে অসংখ্য মামলা ছিল। এসব মামলায় এক জেলা থেকে আরেক জেলায় নেওয়া হতো তাদের। এ কারণে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার বারবার তারিখ পড়েছে। পরে অবশ্য সারা দেশের আদালতের সঙ্গে সমন্বয় করে এই মামলার তারিখ নির্ধারণ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া আসামিপক্ষ থেকে বারবার সময় চাওয়া, ট্রাইব্যুনালের আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে বিভিন্ন আবেদন করায় বিচারও বারবার পিছিয়ে যায়। প্রত্যেক আসামির পক্ষে সাক্ষীদের জেরা করার সুযোগ দেওয়ায়ও বিলম্বিত হয় বিচার।
গত ১৮ সেপ্টেম্বর উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি সমাপ্ত ঘোষণার পর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এর বিচারক শাহেদ নুর উদ্দিন রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আট আসামির জামিন বাতিল করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
গত বছরের ২৩ অক্টোবর এই মামলার যুক্তিতর্ক শুনানি শুরু হয়। টানা ১১৯ কার্যদিবস যুক্তিতর্ক শুনানি হয়। এর আগে রাষ্ট্রপক্ষে ২২৫ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়।
২১ আগস্টের ওই গ্রেনেড হামলায় সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আওয়ামী লীগের তখনকার মহিলাবিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। আহত হয় কয়েক শ মানুষ। গ্রেনেডের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছিলেন ঢাকার তৎকালীন মেয়র মোহাম্মদ হানিফ। কয়েক বছর ধুঁকে পরে তিনি মারা যান। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্দেশ্যে ওই হামলা চালানো হলেও দলের উপস্থিত নেতাকর্মীরা মানবঢাল তৈরি করে কোনো মতে তাঁকে রক্ষা করেন। তবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শেখ হাসিনার শ্রবণ ইন্দ্রিয়।
রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন অ্যাডভোকেট সৈয়দ রেজাউর রহমান, মোশাররফ হোসেন কাজল, আবু আবদুল্লাহ ভূঞা প্রমুখ। আসামিপক্ষে ছিলেন অ্যাডভোকেট এস এম শাহজাহান, খন্দকার মাহবুব হোসেন, আবদুস সোবহান তরফদার, রফিকুল ইসলাম তারা মিয়া, সাইফুর রশিদ সবুজ, নজরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আহসান, আবদুর রশিদ মোল্লা প্রমুখ। এ ছাড়া ১৫ জন পলাতক আসামির পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন রাষ্ট্রনিয়োজিত আইনজীবীরা।

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here