কিশোর মুক্তিযোদ্ধা - Chuadanga News | চুয়াডাঙ্গা নিউজ | ২৪ ঘন্টাই সংবাদ

Sidebar Ads

test banner

Breaking

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Wednesday, December 20, 2017

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা

সন্ধ্যারাতে আঁধারের মাঝে গা ঢাকা দিয়ে মোতাহার আলী বাড়ি ফিরলেন। কনকনে শীত বাইরে। মোতাহার আলী ছাই রঙের একটি শাল গায়ে জড়িয়েছিলেন। তার শালের ভেতর ছিল একটি আগ্নেয়াস্ত্র। সম্পূর্ণ লোহার তৈরি আগ্নেয়াস্ত্রটি দেখে রফিকের মনে কৌতূহল জাগল। পরে সে কাকাকে জিজ্ঞেস করল, কাকু। তোমার ওই যন্ত্রটির নাম কি?
রফিক মোতাহার আলীকে ‘কাকু’ বলে ডাকে। মোতাহার আলী নিজের মুখে আঙ্গুল চেপে বললেন, একদম চুপ! জোরে কোন কথা বলবি না। এটার নাম এলএমজি।
রফিক তখন ফিসফিস করে বলল, কাকু। এলএমজি মানে কি?
মোতাহার আলী বললেন, এলএমজি মানে হল লাইট মেশিনগান। এটা দিয়ে একসাথে অনেক গুলি করা যায়।
মোতাহার আলীর কথা শুনে রফিক বলল, ও আচ্ছা। পরে সে একটু দম নিয়ে বলল, কাকু। তোমরা কেমন করে মুক্তিযুদ্ধ কর?
মুক্তিযোদ্ধা মোতাহার আলী বুঝলেন, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে রফিকের মনে অনেক কৌতূহল। পরে তিনি বুঝিয়ে বললেন বিষয়টা। আমরা প্রথমে পাকিস্তানি মিলিটারিদের ক্যাম্প সনাক্ত করি। তাদের অবস্থান সনাক্ত করি। তারপর সুযোগ বুঝে দলবেঁধে গিয়ে হামলা চালাই।
শুনে রফিক বলল, তোমরা কী সৈন্যদের একেবারে মেরে ফেল কাকু?
মোতাহার আলী বললেন, হ্যাঁ। নাগালে পেলে আর রক্ষা নেই। একেবারে মেরেই ফেলি।
রফিক বলল, আচ্ছা কাকু। ওরা তোমাদের মারে না?
মোতাহার আলী বললেন, মারে না বুঝি বেটা! আমাদের ধরতে পারলে তারা তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মারে। যুদ্ধক্ষেত্রে তারা আমাদের পাখির মত গুলি করে মারে।
মোতাহার আলীর কথা শুনে মনে হল রফিকের গা কাঁটা দিয়ে উঠেছে। বলল সে, পাকিস্তানি সৈন্যরা তো খুবই খারাপ কাকু।
মোতাহার আলী বললেন, শুধু খারাপ বলছিস কী রে বেটা। ওরা তো এক একটা হায়েনা। অসুরের পাল।
মোতাহার আলীর কথা শুনে রফিক একটু দম নিয়ে বলল, কাকু। আমি তোমার সাথে মুক্তিযুদ্ধে যেতে চাই। তুমি কী আমাকে সঙ্গে নিবে?
মোতাহার আলী বললেন, তুই আমার সাথে গিয়ে কী করবি রে বেটা?
রফিক বলল, আমিও তোমার সাথে মুক্তিযুদ্ধ করব কাকু। অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করব। পাকিস্তানি সৈন্যদের মেরে একেবারে তক্তা বানিয়ে ফেলব।
ছোট্ট রফিকের মুখে পাকিস্তান বিরোধী কথা শুনে মোতাহার আলীর ভালো লাগল। সে মুক্তিযুদ্ধ করতে চায় শুনে মোতাহার আলীর সে কী আনন্দ! হেসে হেসে তিনি বললেন, তুই মুক্তিযোদ্ধা হবি বেটা! অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করবি! পাকিস্তানি সৈন্যদের পাখির মত গুলি করে মারবি! বাহ্ চমৎকার তো! আমাদের এ দেশটা স্বাধীন না হয়ে আর যায় না রে বেটা! স্বাধীন না হয়ে যায় না।
রফিক আবার বলল, আমাকে সঙ্গে নিবে তো কাকু?
মোতাহার আলী বললেন, বেটা রে তুই ছোট্ট এতটুকুন। তোর বয়স মাত্র বার বছর। তুই কী মুক্তিযুদ্ধ করবি? তার চেয়ে বরং তুই এক কাজ কর। বাড়িতে থেকে তোর দাদি আর কাকিমাকে দেখেশুনে রাখ।
রফিক বলল, কাকু। আমি তো সবসময় তাদের দেখেশুনেই রাখি।
মোতাহার আলী বললেন, এই তো ঠিক আছে। তোর মুক্তিযুদ্ধ করা লাগবে না বাবা। আমি আছি না বেটা।
রফিক এবং মোতাহার আলীর কথার মাঝে তার দাদি বোল ভরে চিতই পিঠা আর খেজুরের গুড় এনে তাদের সামনে রাখলেন। রফিকের কাকিমা পানির গ্লাস এগিয়ে দিলেন। রফিক এবং তার কাকু মজা করে চিতই পিঠা খেতে লাগল। পাশে বসে তার দাদি এবং কাকিমা তাদের পিঠা খাওয়া দেখছেন। পিঠা খাওয়া দেখে খুব আনন্দ পাচ্ছেন। হঠাৎ দাদি হাই তোলে বললেন, পোড়া কপাল আমার। বড় ছেলেটা আজ বেঁচে থাকলে সেও এমনি মুক্তিযোদ্ধা হত। সেও মুক্তিযুদ্ধে যেত।
মায়ের আহাজারি শুনে মোতাহার আলী সান্ত¦না দিয়ে বললেন, মা। ওদের কথা তুমি মনে করো না তো। আমি তো মুক্তিযুদ্ধে গেছি। আমার জন্য দোয়া কর। যেন দেশটা স্বাধীন করে তবেই বাড়ি ফিরতে পারি।
মা বললেন, হ্যাঁ বাবা। সেই দোয়াই তো করি।
রফিকের মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই। দুজনই একসময় ঢাকা শহরে  ছোটখাটো চাকরি করতেন। বছর পাঁচেক আগে ঈদ-উল-ফিতরের ছুটিতে লঞ্চে করে তারা বাড়ি ফিরছিলেন। আসার সময় সেই লঞ্চটা ডুবে গেল। অনেক মানুষ প্রাণ হারাল। রফিকের মা-বাবাও সেই লঞ্চ ডুবিতে মারা গেলেন। রফিকের বয়স তখন সাত বছর। কী করে যেন সে বেঁচে গেল। পরে প্রশাসনের লোকজন ওর মা-বাবার লাশ এবং তাকে এনে বাড়ি দিয়ে গেল। সেই থেকে রফিক ছোট কাকুর পরিবারের সাথেই আছে।
রফিক এবং তার কাকুর খাওয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। এমন সময় তাদের ঘরের দরজায় হঠাৎ ঠকঠক আওয়াজ শোনা গেল। অসময়ে ঠকঠক আওয়াজ শুনে মোতাহার আলীর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে ওঠল। এদিকে ঠকঠক আওয়াজ ক্রমশই বাড়তে লাগল। সে সঙ্গে বাইরে থেকে কেউ একজন বলছে, দরজা খোল। আমরা ঘর সার্চ করতে এসেছি। জলদি দরজা খোল।
এমন পরিস্থিতিতে মোতাহার আলীর মা এসে দরজার কাছে দাঁড়ালেন। বিনয়ভরা কণ্ঠে বললেন, আপনারা কে বাবা? আমাদের ঘরে কী চান?
তখন বাইরে থেকে জবাব এল, আমরা রাজাকারের লোক। দরজা খোল। আমরা তোমাদের ঘরটা একটু সার্চ করব।
রাজাকারের নাম শোনামাত্র মায়ের শরীরে যেন কাঁপুনি শুরু হল। মা বুঝলেন কিছু একটা অঘটন ঘটতে যাচ্ছে। কী করা যায় এখন? পরে কী ভেবে যেন মা বললেন, দরজা তো খোলা যাবে না বাবারা। ঘরের ভেতর অসুস্থ মেয়েছেলে রয়েছে। আপনারা দয়া করে দিনে একবার আসুন।
কিন্তু কে শোনে কার কথা। রাজাকাররা শেষে দরজা ভেঙেই ঘরে এসে ঢুকল। ঘরে প্রবেশ করে তারা মোতাহার আলীকে অস্ত্রসহ পেয়ে গেল। একজন রাজাকার মোতাহার আলীকে ধমক দিয়ে বলল, জলদি অস্ত্র ফেলে দে। অস্ত্র ফেলে দে। নইলে কিন্তু...বলে লোকটি তার দিকে বন্দুক তাক করল।
মোতাহার আলী একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। এত সহজে তিনি রাজাকারদের কাছে ধরা দিবেন নাকি? সঙ্গে সঙ্গে তিনি এলএমজি উঁচিয়ে পাল্টা হুংকার ছাড়লেন, এক পা সামনে এগুবি তো একেবারে জানে মেরে ফেলব। বাঁচতে চাস তো জলদি পালা।
কিন্তু রাজাকাররা তার হুংকারে পিছপা হল না। বরং তারা থ্রি নট থ্রি রাইফেল তুলে গুলি শুরু করল। আর সেই গুলি থেকে ছেলেকে বাঁচানোর জন্য রফিকের দাদি এসে সামনে দাঁড়ালেন। ছেলেকে বাঁচাতে গিয়ে তিনি নিজেই গুলিবিদ্ধ হলেন। রফিকের দাদি মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। চোখের সামনে দাদির শরীর থেকে রক্ত গড়িয়ে যেতে লাগল।
মায়ের এমন করুণ মৃত্যু দেখে মোতাহার আলী এলএমজির ট্রিগার চাপলেন। একচাপে দুজন রাজাকারকে তিনি মাটিতে ফেলে দিলেন। মোতাহার আলীর মাথায় যেন খুন চেপে গেল। তিনি এলএমজি হাতে নিয়ে চিতা বাঘের মত লাফ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। গুলি করতে করতে তিনি সামনে এগোতে লাগলেন। সে সময় তাদের উঠোন থেকে দৌড়ে পালাচ্ছিল আরও পাঁচজন রাজাকার। অবস্থা বেগতিক দেখেই বুঝি তারা লেজ গুটিতে পালাতে চেয়েছিল। কিন্তু মোতাহার আলীর এলএমজির নিশানা থেকে তাদের কেউ বাঁচতে পারল না। বাকি পাঁচজন রাজাকারও ভূমিতে লুটিয়ে পড়ল।
সে রাতেই মায়ের দাফন কর্ম কোনরকম সারলেন মোতাহার আলী। তিনি বুঝতে পারলেন বাড়িতে বেশি সময় অবস্থান করাটা তাদের জন্য আর নিরাপদ নয়। ভেবে স্ত্রী এবং ভাতিজা রফিককে সাথে নিয়ে তিনি পলায়ন করলেন। মোতাহার আলী তাদেরকে তার শ্বশুরবাড়িতে নিয়ে গেলেন। শ্বশুরবাড়িতে তাদের লুকিয়ে রেখে সে রাতেই তিনি আবার মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।
এদিকে সারা দেশে তুমুল মুক্তিযুদ্ধ চলছে। মাতৃভূমিকে শত্রু মুক্ত করতে এদেশের নোওজোয়ানরা রণাঙ্গনে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে একরাতে খবর এল মোতাহার আলী মাথায় গুলি খেয়েছেন। তার মস্তিষ্কে অনেক রক্ত ক্ষরণ হয়েছে। শেষ রাতের দিকে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা মোতাহার আলীর লাশটি ধরাধরি করে এনে শ্বশুরবাড়িতে দিয়ে গেলেন।
স্বামীর মৃত্যুতে রফিকের কাকিমা যেন ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। স্বামীর শোকে বার বার তিনি মূর্ছা গেলেন। মোতাহার আলীর শ্বশুরবাড়ির সকলেই কেমন যেন স্তব্ধ হয়ে গেলেন। থমকে গেল রফিকও। ছোট কাকুর মৃত্যুতে সে যেন কেমন মতিহারা হয়ে পড়ল। কাউকে কিছু না বলে একদিন সে চুপচাপ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ল। কোথায় গেল কেউ কিছু বলতে পারল না। শেষে সকলে ধরে নিলেন হয় সে মুক্তিযুদ্ধে গেছে, না হলে মিলিটারিদের হাতে মারা গেছে।
লোকের প্রথম ধারণাটাই সঠিক হল। রফিক আসলে মারা যায়নি। সে মুক্তিযুদ্ধ করতে বেরিয়েছে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে অনেক খোঁজ নিয়ে প্রথমে সে একটি মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে গেল। ক্যাম্পের কমান্ডার আব্দুল লতিফ। ক্যাম্পে গিয়ে কমান্ডার লতিফ সাহেবকে সে তার দাদি এবং চাচার মৃত্যুর কথা খুলে বলল। লতিফ সাহেবকে সে এটাও বলল যে, দেশ স্বাধীন না হলে সে আর বাড়ি ফিরে যাবে না। সব শুনে কমান্ডার আব্দুল লতিফ রফিককে তাদের সাথে থাকার অনুমতি দিলেন।
সেই থেকে রফিক মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে থাকে খায় আর তাদের ফুট ফরমাশ করে। মুক্তিযোদ্ধারাও তাকে খুব পছন্দ করত। মুক্তিযোদ্ধাদের বিশ্রামের সময় রফিক তাদের দাদির মুখে শোনা নানান গল্প আর কিচ্ছা-কাহিনী শোনাত। কিচ্ছা-কাহিনী শুনিয়ে তাদের আনন্দ দিত। এভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে থাকতে থাকতে রফিক তাদের অনেক বিশ্বস্ত হয়ে ওঠে। মাঝেমধ্যে রফিক খেলার ছলে বিভিন্ন অস্ত্র চালানোর প্রশিক্ষণ নিতে থাকে। বলা যায় দেখে দেখেই সে থ্রি নট থ্রি রাইফেল চালানো শিখে ফেলল।
ক্যাম্পে একজন বয়স্ক লোক ছিল। আব্দুর রহিম নাম। ছোটখাটো মানুষ। রফিক তাকে রহিম কাকু বলে ডাকত। রহিম কাকু ছিলেন গ্রেনেড ছোড়ায় ওস্তাদ। রফিক তার সাথে মজা করার জন্য প্রায়ই ঠাট্টা করত। তিনিও ঠাট্টার জবাব দিতেন। রফিক একদিন তার কাছে গিয়ে বলল, রহিম কাকু। আপনি গ্রেনেড ছোড়ায় ওস্তাদ। আর আমি মাটির ঢেলা ছোড়ায় ওস্তাদ। আপনি চাইলে আমি আপনাকে মাটির ঢেলা ছোড়া শেখাতে পারি।
রফিকের পাকামো কথা শুনে আব্দুর রহিম মিটিমিটি হাসলেন। তিনি বুঝলেন, রফিক আসলে তাকে মাটির ঢেলা ছোড়া শেখাতে চাচ্ছে না। চাচ্ছে, সে নিজে গ্রেনেড ছোড়া শিখতে। কারণ মাটির ঢেলা ছোড়ায় শেখার কিছু নেই। যে কেউ কাজটি অনায়াসে করতে পারে। পরে তিনি বললেন, আমি যদি তোকে গ্রেনেড ছোড়া শেখাই; তুই ঠিকমত গ্রেনেড ছুড়তে পারবি তো বেটা?
রহিম কাকুর কাছ থেকে গ্রেনেড ছোড়া শেখার সবুজ সংকেত পেয়ে রফিক বলল, কী যে বলেন না কাকু। আমি খুব পারব। অবশ্যই পারব। পারতেই হবে আমাকে। আপনি আমাকে একবার শিখিয়েই দেখুন না।
পরে আব্দুর রহিম বললেন, আয় তাহলে শিখিয়ে দেই। বলে তিনি একটি গ্রেনেড হাতে নিয়ে রফিককে দেখালেন কীভাবে এর পিন খুলতে হয়। পিন খোলার সাথে সাথে কীভাবে গ্রেনেড ছুড়ে মারতে হয়। নইলে ভয়ানক বিস্ফোরণ ঘটবে। রফিক কৌতূহলী ছেলে। কোন কিছু শেখার জন্য তার মনে কৌতূহলের সীমা নেই। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই সে গ্রেনেড ছোড়ার কৌশলটি পুরোপুরি রপ্ত করে ফেলল।
গ্রেনেড ছোড়া শেখার পর রফিক এবার নজর দিল কমান্ডার আব্দুল লতিফ সাহেবের এলএমজিটির দিকে। যন্ত্রটি তার পূর্বপরিচিত। কারণ তার চাচা মোতাহার আলী এই যন্ত্রটিই চালাতেন। চাচা বলেছিলেন, এই যন্ত্রটি নাকি এক চাপে অনেক গুলি ছুড়তে পারে। এলএমজি কী করে যে এক চাপে অনেক গুলি ছোড়ে, এ বিষয়টি কিছুতে রফিকের মাথায় ঢুকে না। তাই এলএমজি শেখার প্রতি তার খুব ঝোঁক।
কমান্ডার আব্দুল লতিফ একজন গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। তার দিকে তাকালে মনে হয় তিনি বুঝি সারাক্ষণই রেগে আছেন। কার ওপর যে তার এত রাগ তা রফিক ভালোই জানে। কমান্ডার চাচার যত রাগ সবই পাকিস্তানি মিলিটারিদের প্রতি। কীভাবে পাকিস্তানি সৈন্যদের শায়েস্তা করা যায়, কীভাবে তাদের দেশ ছাড়া করা যায়; তিনি সব সময় সে চিন্তাই করেন। তাই তাকে দেখলে খুব গম্ভীর মনে হয়। রাগী রাগী মনে হয়।
রফিক একদিন কমান্ডার সাহেবের এলএমজিটি নেড়েচেড়ে দেখছিল। তার ভাবখানা এমন যেন এটি আর এমন কী অস্ত্র। শেখালে সে অনায়াসে শিখে নিতে পারবে। তার কা-কারখানা অদূরে দাঁড়িয়ে খেয়াল করলেন কমা-ার আব্দুল লতিফ। তিনি বুঝলেন ছেলেটির মনে শেখার আগ্রহ আছে। পরে তিনি বললেন, কী রে বেটা! এলএমজি চালানো শিখতে চাস নাকি? বলে তিনি ওর হাত থেকে যন্ত্রটি নিয়ে প্রথমে পার্ট পার্ট করে এটাকে খুলে ফেললেন। খুলে তিনি যন্ত্রের ভেতরটা রফিককে দেখালেন। কোন অংশের কী নাম শেখালেন। পরে পার্টগুলো আবার যথাস্থানে লাগিয়ে যন্ত্রে বুলেট ভরে দেখালেন কীভাবে এক চাপে এটি অনেক গুলি ছোড়ে। এলএমজির গুলি ছোড়া দেখে রফিক রীতিমত তাজ্জব হয়ে গেল। মনে মনে সে ভাবল, যে করে হোক এলএমজি চালানো সে শিখবেই শিখবে। এমন একটি অস্ত্র তার চাই-ই চাই।
এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধারা আরও একটি সফল অভিযান চালালেন। অপারেশন চানপুর ক্যাম্প। মুক্তিযোদ্ধারা অতর্কিত হামলা চালিয়ে চানপুরের মিলিটারি ক্যাম্পটি দখল করে নিল। অপারেশনে পঁয়ত্রিশ জনের মত মিলিটারি খতম হল। দুজন মাত্র মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হল। পাকিস্তানি মিলিটারিদের আগ্নেয়াস্ত্রের একটি বড় মজুদ মুক্তিযোদ্ধাদের অধীনে চলে এল। এগুলোর মধ্যে অনেক চাইনিজ রাইফেল এবং বেশ কয়েকটি এলএমজিও ছিল।
ইতোমধ্যে রফিক এলএমজি চালনাও শিখে গেল। একদিন সে কমান্ডার সাহেবকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে সত্যি সত্যি একটি এলএমজির মালিক হয়ে গেল। সেই থেকে এলএমজিটি সবসময় রফিকের সাথে থাকত। চলতে-ফিরতে খেতে-বসতে সে এলএমজিটি হাতের কাছেই রাখত।
মুক্তিযোদ্ধারা একদিন অরূপ নদীর ওপারে একটি পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দেওয়ার জন্য মনস্থির করলেন। কারণ ওই পাওয়ার স্টেশনের জন্য মিলিটারিরা অনেক সুবিধা পাচ্ছে। পাওয়ার স্টেশনটি উড়িয়ে দিতে পারলে তারা বিরাট অসুবিধায় পড়ে যাবে। পাওয়ার স্টেশনটির অবস্থান অরূপ নদীর ওপারে হওয়ায় অপারেশন চালানোর জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের ওপারে যেতে হবে। তাদের আগে থেকেই জানিয়ে রাখা হয়েছিল অরূপ নদীর ওপারে আরও একটি মুক্তিযোদ্ধা দল এসে তাদের সাথে যোগদান করবে। তারা তাদের কভারেজ দেবে। সে মত সময়ও নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু নদীর ওপারে গিয়ে তারা ভুল তথ্যের শিকার হলেন। তারা গিয়ে দেখল, ওপারে যে সকল মুক্তিযোদ্ধার আসার কথা ছিল তারা তখনও আসেনি। মুক্তিযোদ্ধাদের বদলে সেখানে দাঁড়িয়ে আছে বেশ কয়েকজন মিলিটারি। খুব সহজেই শিকার নাগালে পেয়ে মিলিটারিরা তাদের ঘিরে ফেলল। তারপর তারা মুক্তিযোদ্ধাদের হাত থেকে অস্ত্রগুলো কেড়ে নিল। তারা তাদের মাটিতে বসিয়ে রেখে অস্ত্র তাক করে রইল।
ঠিক সে সময় নদীর পার ধরেই হেঁটে যাচ্ছিল রফিক। আগে থেকেই সে জানত, ওপারে আজ মুক্তিযোদ্ধারা পাওয়ার স্টেশন উড়িয়ে দিতে যাবে। এপার থেকে রফিক তাকিয়ে দেখল, ওপারে কয়েকজন মিলিটারি মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে রেখেছে। এ অবস্থায় রফিক ঠিক করল, সে ওপারে যাবে। গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করবে। কিন্তু নদী ভরা থইথই পানি। রফিক নদী পার হবে কেমন করে?
এমন সময় রফিকের চোখে পড়ল, তীরের পাশ দিয়ে একটি ভাসমান মরা হাতি যাচ্ছে। হাতিটি হয়ত ভারত থেকে নেমে এসেছিল। কোন কারণে হয়ত ওটা মরে গিয়ে পানিতে ভাসছিল। তৎক্ষণাৎ রফিকের মাথায় একটি বুদ্ধি এল। বুদ্ধিমত সে কাজে লেগে গেল। রফিক কমান্ডোদের মত সাঁতরে গিয়ে ভাসমান মরা হাতিকে ঝাপটে ধরল। তারপর সে সাথে রাখা চাকু দিয়ে হাতিটির পেট কেটে এর ভেতর ঢুকে পড়ল। হাতির পেটে ঢুকে নিজেকে লুকিয়ে রেখে নৌকার মত হাত দিয়ে সে বাইতে লাগল। বাইতে বাইতে নদীর ওপারে তীরের প্রায় কাছাকাছি চলে এল রফিক। তীরের কাছাকাছি এসে সে মিলিটারিদের লক্ষ্য করে এলএমজি থেকে গুলি ছুড়তে লাগল। তার অতর্কিত গুলিতে মিলিটারিগুলো কোন কিছু বুঝতে না বুঝতেই ধরাসায়ি হল। সেই সুযোগে আটক মুক্তিযোদ্ধারা ক্রলিং করে করে নদীর তীর ঘেঁষে নিরাপদ দূরত্বে চলে এল। রফিকের বুদ্ধির কারণেই  এতগুলো মুক্তিযোদ্ধা প্রাণে বেঁচে গেলেন।
মুক্তিযোদ্ধারা কিন্তু প্রথমে বুঝতে পারেনি কে তাদের নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে দিল। পরে যখন বুঝতে পারল, তখন রফিককে ঘিরে তাদের আনন্দ যেন আর ধরে না

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here