ফেসবুক বাঁচাতে মরিয়া জাকারবার্গ! - Chuadanga News | চুয়াডাঙ্গা নিউজ | ২৪ ঘন্টাই সংবাদ

Sidebar Ads

test banner

Breaking

Home Top Ad

Responsive Ads Here

Post Top Ad

Responsive Ads Here

Sunday, January 14, 2018

ফেসবুক বাঁচাতে মরিয়া জাকারবার্গ!

একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মারুফ হোসেন। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হাড়ভাঙা খাটুনির পর বাসায় ফিরেই ল্যাপটপ খুলে বসেন তিনি। উদ্দেশ্য থাকে ফেসবুকে বন্ধুবান্ধবের খবরাখবর নেওয়া। কিন্তু ইদানীং বন্ধুদের খোঁজের চেয়ে ফেসবুকের নিউজ ফিডে আসা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন দেখতেই সময় যায় তাঁর। কৌতূহলবশত সেসবে ক্লিকও করেন। শেষে আর বন্ধুদের খোঁজ পাওয়া হয় না। এভাবেই এক ঘনিষ্ঠ বন্ধুর জন্মদিনে শুভেচ্ছাও জানানো হয়নি তাঁর। আর তা নিয়ে মান-অভিমানে সে এক বিতিকিচ্ছি কাণ্ড!

ফেসবুক হলো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম। দূরত্ব যা-ই হোক, মানুষে মানুষে নৈকট্য অটুট রাখাই ছিল ফেসবুকের প্রাথমিক উদ্দেশ্য। কিন্তু ফেসবুক আর শুধু সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই; এখন এটি হয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ফেসবুকে পেজ খুলে ব্যবসার বিষয়টি এখন অনেক প্রসার লাভ করেছে। তা ছাড়া সব প্রতিষ্ঠানই এখন ভোক্তাদের কাছে নিজেদের তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে থাকে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে। সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের সংবাদ প্রচারের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ফেসবুক ব্যবহার করে।
ফেসবুকের এই নানা ব্যবহারের কারণ একটাই—তা হলো এর সঙ্গে যুক্ত বিশ্বের প্রায় কোটি কোটি মানুষ। অঙ্কের হিসাবে প্রায় ২০০ কোটি। একটি ওয়েবসাইট থেকে যদি এত বিপুল মানুষের সঙ্গে আপনি যোগাযোগের সুযোগ পান, তবে তা গ্রহণ করাই স্বাভাবিক। কিন্তু সুবিধা যেমন প্রচুর আছে, তেমনি ফেসবুক ইদানীংকালে কিছু অসুবিধারও মুখোমুখি হয়েছে। সেগুলো হলো, ভুল সংবাদ ও গুজব প্রচার এবং তা থেকে সৃষ্ট সহিংসতা। মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন থেকে শুরু করে ভারতের নানা ঘটনায় এটি স্পষ্ট যে ফেসবুকে মিথ্যা সংবাদ প্রচারের কারণে মানবগোষ্ঠীর গুরুতর ক্ষতি হতে পারে, মানুষের জীবন পড়তে পারে হুমকির মুখে।

এসব বিষয় নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে অনেক সংবাদ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এমনকি সামাজিক মাধ্যমে আসক্তি যে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তাও আলোচিত হয়েছে। নতুন করে এই বিষয়গুলো সামনে নিয়ে এসেছেন খোদ ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ। গত মাসেই তিনি বলেন, বড়সড় পরিবর্তন আসতে চলেছে ফেসবুকে। গত বৃহস্পতিবার এক ঘোষণায় জাকারবার্গ বলেন, ফেসবুকের মূল পাতার অ্যালগরিদম (কম্পিউটারের নির্দিষ্ট প্রোগ্রাম চালানোর জন্য গাণিতিক ভাষায় লেখা নিয়ম) বদলে যাচ্ছে। ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বা সংবাদমাধ্যমের ফিড ও বিজ্ঞাপনের চেয়ে এখন ফেসবুক গুরুত্ব দেবে ব্যবহারকারীর বন্ধু ও স্বজনদের খবরকে। অর্থাৎ এখন থেকে ধীরে ধীরে ব্যবহারকারী তাঁর বন্ধুবলয়ের খবর, মন্তব্য, ভিডিও বেশি দেখবেন। শিগগিরই বিশ্বজুড়ে ফেসবুক ব্যবহারকারীরা এ পরিবর্তন দেখতে পাবেন।এ নিয়ে অবশ্য কয়েক মাস ধরেই ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছিলেন জাকারবার্গ। গত সেপ্টেম্বর মাসে লেখা এক ফেসবুক পোস্টে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কাজ যে পদ্ধতিতে হয়েছে, তাতে মানুষকে কাছে আনার বদলে বিভক্তি বেড়েছে বেশি। আমি এর জন্য ক্ষমাপ্রার্থী এবং অবস্থার উন্নতি করতে আমি কাজ করব।’ নতুন বছরের শুরুতে সেই প্রতিশ্রুতিই রাখলেন বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগের পদ্ধতি বদলে দেওয়া এই ব্যক্তি।

আসলে কী চান জাকারবার্গ?
গুগল যখন গুগল প্লাস চালু করেছিল, তখন ফেসবুককে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এগিয়ে রাখতে কর্মীদের ওপর ব্যাপক চাপ দিয়েছিলেন জাকারবার্গ। কয়েক বছর আগে যখন মহাসমারোহে প্রযুক্তিপ্রেমীদের হৃদয়ে জায়গা করে নিচ্ছিল স্ন্যাপচ্যাট, তখন ওই কোম্পানিই কিনে নিতে চেয়েছিলেন ফেসবুকের এই কর্তা। কিন্তু এখন নিজের প্রতিষ্ঠানকেই ‘হুমকি’ মনে করছেন মার্ক জাকারবার্গ। তাঁর মতে, কোটি কোটি মানুষের কল্যাণের জন্যই ফেসবুকের ‘ত্রুটি’ সারানো প্রয়োজন এবং ২০১৮ সালজুড়ে সেই কাজটিই করতে চান তিনি।

সংবাদ সংস্থা সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফেসবুকে শেয়ার হওয়া মিথ্যা খবরের বিষয়টি আলোড়ন তুলেছিল। এ ছাড়া ওই সময়ে মার্কিন মুলুকে রুশ প্রোপাগান্ডা, হিলারি ক্লিনটনকে ঘিরে মিথ্যা সংবাদ প্রচার, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ফেসবুক ব্যবহার করে ঘৃণা ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য প্রচারের বিষয়টিও সামনে চলে আসে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশে ফেসবুক ব্যবহার করে জাতিগত বিদ্বেষ ও সংঘাত ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা অহরহই ঘটছে। এখন এই বিষয়টিই জাকারবার্গ সামনে নিয়ে এসে ফেসবুকের অ্যালগরিদম পরিবর্তন করছেন। এর আগে ফেসবুকের সাবেক কর্মীদেরও আক্ষেপ করতে দেখা গেছে যে কী বানিয়েছেন তাঁরা!

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়েছে, এসব ঘটনা আদালতেও নিয়ে গেছে ফেসবুককে। আগামী বুধবার ক্যাপিটল হিলের আদালতে এক শুনানিতে হাজিরা দিতে হবে ফেসবুক কর্তৃপক্ষকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে মৌলবাদী প্রোপাগান্ডা চালানোর অভিযোগে এই মামলা চলছে। শুধু ফেসবুক নয়, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের তালিকায় টুইটার ও ইউটিউবও আছে।

সিএনএন বলছে, এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ মানুষের মধ্যকার ইতিবাচক শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে চাইছে। প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বকে দেখাতে চায় যে মানুষের কল্যাণের জন্য কিছু করতে চেষ্টা করছে তারা।

নতুন বছরের শুরুতেই জাকারবার্গ এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ফেসবুক ব্যবহার করে হয়রানি ও ঘৃণার প্রসার রোধ করতে চান তিনি। একই সঙ্গে বিভিন্ন জাতিরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপও বন্ধ করতে চান। মোদ্দা কথা, ব্যবহারকারীরা ফেসবুকে যেন ‘ভালো সময়’ কাটাতে পারেন, সেটি নিশ্চিত করতে চান তিনি।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাকারবার্গ শুধু ফেসবুকের নয়, সেই সঙ্গে নিজের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করতে চাইছেন। ব্লুমবার্গ বলছে, জাকারবার্গ চাইছেন মানুষ যেন অযথা ফেসবুকে স্ক্রল না করেন। এর পরিবর্তে মানুষে মানুষে অর্থপূর্ণ মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তিনি। আদতে এটিই ছিল শুরুর সময় ফেসবুকের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু নানা কারণে তা থেকে ধীরে ধীরে সরে গেছে প্রতিষ্ঠানটি।

ধাক্কা খাবে ফেসবুক?
৩৩ বছর বয়সী সহপ্রতিষ্ঠাতার পরিবর্তনের ঘোষণার পরপরই গত শুক্রবার ফেসবুকের শেয়ার মার্কেটে ধস নেমেছে। নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠানটির স্টক কমে গেছে শতকরা প্রায় ৪ শতাংশ, ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। ব্লুমবার্গ বিলিয়নিয়ারস সূচকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা গেছে, এই এক দিনে জাকারবার্গের সম্পদ কমে হয়েছে ৭৪ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।

সিএনএনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জাকারবার্গের সাম্প্রতিক ঘোষণায় এরই মধ্যে নড়েচড়ে বসেছে প্রকাশক ও বিনিয়োগকারীরা। গত শুক্রবার এরই প্রতিফলন দেখা গেছে স্টক মার্কেটে। তাঁরা মনে করছেন, ফেসবুকের অ্যালগরিদম পরিবর্তনের কারণে এই মাধ্যম ব্যবহার করে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে।

ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, স্টক এক্সচেঞ্জে ফেসবুকের শেয়ারের দাম যদি শুক্রবারের মতোই কমতে থাকে, তবে বড় ধাক্কা খাবে ফেসবুক। বিশ্বের সবচেয়ে ধনীদের তালিকায় জায়গা হারাতে পারেন জাকারবার্গ। বর্তমানে এই তালিকায় চতুর্থ ধনী ব্যক্তি তিনি। ফেসবুকে ব্যবহারকারীরা যত বেশি সময় কাটাবে, তত বেশি লাভ প্রতিষ্ঠানটির। সেই সময়ের অনুপাতেই বিজ্ঞাপনের হার ওঠানামা করে। এখন ব্যবসা-সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই ফেসবুকে ব্যবহারকারীদের কাটানো গড় সময়ের পরিমাণ কমে আসবে। তাতে সরাসরি কমে যাবে প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব।

এই বিষয়টি জাকারবার্গের ভাবনাতেও আছে। তিনি স্বীকার করে নিয়েছেন যে ফেসবুকে ব্যবহারকারীদের সময় কাটানোর হার কমে যাওয়াটা প্রত্যাশিত। তবে নিজের সিদ্ধান্তে অটল তিনি। সাক্ষাৎকারে জাকারবার্গ বলেছেন, ‘আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে আমাদের পণ্য শুধু মজা করার জন্য নয়। এটি মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি করা হয়েছে। ফেসবুকের সিস্টেমে আবার মনোযোগ দেওয়া দরকার।’ তিনি আরও বলেন, ব্যবসায় সাময়িক ক্ষতি হলেও যদি মানুষের সন্তুষ্টি পাওয়া যায়, তবে একসময় ব্যবসায় লাভই হবে।পারবেন জাকারবার্গ?
গণমাধ্যম বিনিয়োগকারী এজেন্সি গ্রুপ এম জানিয়েছে, ২০১৭ সালে ডিজিটাল দুনিয়ার বিজ্ঞাপন খাতের ৮৪ শতাংশ ছিল গুগল ও ফেসবুকের দখলে। এ ছাড়া সংবাদমাধ্যমের ব্যবসার জন্যও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষণা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪৫ শতাংশ নাগরিক ফেসবুক থেকেই খবর পড়ে। বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এই হার বেশি বৈ কম নয়।

প্রতিবছর ফেসবুকের রাজস্ব প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা থাকে ৩৯ শতাংশ। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের বিশ্লেষণে এ তথ্য জানিয়ে বলা হয়েছে, আর্থিক সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান বার্কলেইসের বিশ্লেষকদের পূর্বাভাস অনুযায়ী ফেসবুকের মূল পাতার অ্যালগরিদমে পরিবর্তনের কারণে প্রতিষ্ঠানটির রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

ব্লুমবার্গের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সম্প্রতি স্টক মার্কেটে ফেসবুক যে ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে, সেই ধারা যদি সামনের কয়েক মাসেও অব্যাহত থাকে, তবে কত দিন বিনিয়োগকারীরা ফেসবুকের পাশে থাকেন, সেটি ভাবনার বিষয়।

তবে ফেসবুকও কিন্তু বসে নেই। গত বছর থেকেই এসব বিষয় নিয়ে বিস্তর গবেষণা চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। গত নভেম্বরে বিপণনের অন্য উৎসগুলো নিয়ে কাজ করার ঘোষণা দিয়েছিল ফেসবুক। বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিজ্ঞাপন দেখানোর জন্য অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের সাহায্য নিতে পারে ফেসবুক। যেমন ছবি শেয়ার করার প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রাম ও মেসেজিং অ্যাপ ফেসবুক মেসেঞ্জারে বিজ্ঞাপন দেখানোর ব্যবস্থা করা হতে পারে।

গত বৃহস্পতিবার দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্ক জাকারবার্গ বলেন, ‘একটি যন্ত্রকে ভালো ও খারাপ—দুই কাজেই ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু তাতেই ওই যন্ত্রটি খারাপ হয়ে যায় না। নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে আপনাকে বুঝতে হবে, তবেই তা সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারবেন।’

জাকারবার্গ বলেছেন, সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তের কারণে প্রতিষ্ঠান স্বল্প সময়ের জন্য আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ প্রক্রিয়া চলবে। তিনি বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে ম্যাক্সিমা ও আগস্ট বড় হলে যেন উপলব্ধি করতে পারে যে তাদের বাবা বিশ্বের জন্য ভালো কিছু করেছে। এই বিষয়টি আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ।’

Post Bottom Ad

Responsive Ads Here